Header Ads

1 / 5
1 / 5
1 / 5
1 / 5
1 / 5

কবির বিচার / সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়

 


পূর্বপাঠ

কবি- আমি কতদিন আগে মারা গেলাম?

পাঠক- সরকারি নথিতে দুই বছর আর আমাদের হিসেবে দেড় বছর।

কবি -মাত্র ছয় মাস বেঁচে থাকার কারণ?

পাঠক- কারণ আপনি নিজের সময়ে এত ছক, কাঠি, আর তেল মেরেছিলেন যে মৃত্যুর পর আপনাকে বাঁচিয়ে রাখার কেউ ছিল না।

কবি- কেন যে সব অনুজদের পত্রিকায় লেখার সুযোগ করে দিয়েছিলাম তারা?

পাঠক- তারা এখন নিজেদের নিয়েই ব্যস্ত। আর আপনারই পাঠ নিয়ে ছক আঁকছে।

কবি- এত কাজ করলাম এত পত্রিকায় লিখলাম একটাও উঠে আসছে না?

পাঠক - না। কে ওঠাবে। আর তাছাড়া পত্রিকা টত্রিকা এখন বাণ্ডিল হয়ে গেছে। জিও তো আরও সস্তা এখন।

কবি- আর বইগুলো?

পাঠক- আপনি টাকা দিয়ে যা বই করেছিলেন তার বেশিরভাগই চেনা পরিচিত লোকজন, কবি আর পুরস্কার পাবার জন্য বিভিন্ন দপ্তরে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন, পাঠকের হাতে তেমন এলো কই।

কবি- আর যেগুলো অমুক থেকে বের হল?

পাঠক- আরে নামই বলুন না রেকমেন্ডেশনের কথা কেউ শুনতে পাবে না।

কবি - ওই হল। ওগুলোর কী হল?

পাঠক - সে সময় বিক্রি হত এখন আর হয় না দেখে নতুন সংস্করণ বার করে নি।

কবি- আমার ঘরের লোকজন ছেলে মেয়ে কিছুই ব্যবস্থা নিচ্ছে না?

পাঠক- আপনি তাদের ভাল রাখার কোনও ব্যবস্থা নিয়েছিলেন? তারা বেশ সুখেই আছে চাকরি বাকরি করছে। এসবের ঝামেলায় নেই।

কবি - আহ। যাক শান্তি পেলাম।

বিচার পর্ব ১

চিত্রগুপ্ত - বলুন যাহা বলিবেন সত্য বলিবেন কাব্য করিবেন না।

কবি- যাহা বলিব সত্য বলিব কাব্য করিব না।

চিত্রগুপ্ত - আপনি যেদিন প্রথম ফেসবুকে লগ ইন করলেন সেদিন ঠিক কী ভেবেছিলেন?

কবি- ভেবেছিলাম নতুন কবিরা আসবে আর আমাকে মাথায় তুলে নাচবে।

চিত্রগুপ্ত- তা হয়েছিল?

কবি- আলবাত হয়েছিল স্যার, আমি একটা পোস্ট দিলেই হাজার লাইক।

চিত্রগুপ্ত- তা আপনি নতুন কবিদের নিয়ে পোস্ট দিতেন?

কবি- তেমন না, মানে ওই প্রয়োজন বোধ করলে দু এক।

চিত্রগুপ্ত- হেঁয়ালি করবেন না, এটা আপনার নাট্য করার জায়গা না, প্রয়োজন মানে?

কবি- স্যার প্রয়োজন বলতে আমি একটু উঠি আমাকে নিয়ে ও একটু উঠুক এমন।

চিত্রগুপ্ত- যম, মাই লর্ড নোট করবেন। কবিবর নিজের প্রয়োজনে অন্যের পোস্ট শেয়ার করতেন। অর্থাৎ ভাল না লাগা, ভাল না হওয়া কবিতাও এর মধ্যে থাকত।

নিজের প্রয়োজনে নিজের পরিচিত অনুজ কবিকে সুযোগ করে দেওয়া এক অপরাধ।

যম- নোট হল।

চিত্রগুপ্ত - আপনার সব বই কী নিজের লেখা? আপনি হলপ করে বলতে পারেন আপনি একটিও শব্দ, একটি লাইনও টোকেন নি?

কবি- তা কী করে বলি, এত বই পড়েছি দু এক তো ঢুকে যেতেই পারে।

চিত্রগুপ্ত- আমার খাতা বলছে প্রথম দিকে অনিচ্ছাকৃত টুকলেও পরের দিকে বেশ কিছু ইচ্ছাকৃত টুকেছেন

কবি- কোনও প্রমাণ আছে?

চিত্রগুপ্ত- আপনি পুরাণ গীতা রামায়ণ মহাভারত বেদ উপনিষদ গণিত ফিজিক্স জেনেটিক্স কিছুই বাদ দেননি টোকা থেকে।

কবি- লেখার মধ্যে তো সবই থাকবে।

চিত্রগুপ্ত- তাহলে আপনার কী থাকল, খালি কলম?

কবি মানে?

চিত্রগুপ্ত- নোট করুন মাই লড। ইনি প্রথমে অনুপ্রাণিত লেখা পরে জ্ঞান হতে মহান কাব্য ও অন্যান্য ভাল বই, তরুণ কবিদের ভাল কবিতার সার টুকতে শুরু করেন।

যম- নোট হল।

চিত্রগুপ্ত - আপনি প্রেম করেছিলেন?

কবি- কবি তো প্রেমিক। তার প্রেম সদা চঞ্চল। বেশ কিছু করেছি। আমার তো প্রায় প্রেম হত।

চিত্রগুপ্ত- তার মানে আপনি বহুগামী ছিলেম। এক স্ত্রী তে মন ভরেনি?

কবি- ঠিক সেরকম নয় হুজুর। কাব্যি করতে গেলে প্রেম দরকার, বিরহ দরকার, এমনকী নারী শরীরের রূপ জানতি হয় দেখতে হয়। তবে খারাপ চোখে না স্যার।

চিত্রগুপ্ত- মাই লড যম কবি নিজেই স্বীকার করছেন কবিতা লেখার জন্য বাস্তবে অবাস্তবে বহু প্রেম করেছেন, নারী শরীরও নিজের কাব্যে ব্যবহার করেছেন।

মর্তে যেখানে তাকানোই শ্লীলতাহানি সেখানে উনি নিজের প্রয়োজনে তাকে নিজের মত সাজিয়েছেন। মাই লড নোট করবেন।

যম- নোট হল। আগে বলুন।

চিত্রগুপ্ত- আপনি কী রচনা করতেন একটু ডিটেলে বলুন।

কবি - আমি প্রেম বিরহ যন্ত্রণা সমাজ প্রকৃতি সবকিছু নিয়েই লিখেছি।

চিত্রগুপ্ত- এই যে বললেন প্রেম বিরহ যন্ত্রণা এগুলো কী আপনার নিজস্ব পর্যবেক্ষণ?

কবি - নিশ্চয় স্যার কবির নিজস্ব ভাবনা।

চিত্রগুপ্ত- তাহলে মনে করুণ কেউ আপনার লেখা পড়ে আনন্দ পেয়েছে কেউ কষ্টও পেয়েছে?

কবি- হ্যাঁ স্যার। একজন তো আমাকে বলেছিল আপনার লেখা পড়ে চোখে জল এসে গিয়েছিল। আর একজন বলেছিল মানসিক যন্ত্রণায় ছিলাম আপনার লেখা পড়ে কষ্ট যন্ত্রণা কমে গিয়েছে।

চিত্রগুপ্ত- কথাগুলি ভাল করে শুনবেন মাই লড। এই কবি নিয়তি ও কর্মফলে প্রাপ্ত যন্ত্রণা বা আনন্দে থাকা জীব কে শুধুমাত্র কয়েক পাতা পড়িয়ে যন্ত্রণা প্রাপ্ত জীবকে আনন্দ, আর আনন্দে থাকা জীবকে যন্ত্রণা দিয়ে সুখ দুঃখের ভারসাম্য নষ্ট করেছেন।

যম- কথা ঠিক। নোট করলাম।

চিত্রগুপ্ত- আপনি তো বেশিরভাগ সময় ফেসবুকেই থাকতেন। সকলের লেখা পড়তেন নাকি শুধু প্রচারে থাকার জন্য?

কবি- ফেসবুকের লেখা কে পড়ে। আর সবাই নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত সেখানে। তবে কিছু ভাল লেখা দেখলে কপি করে রাখতাম। আর কে কোথায় লাইক দিচ্ছে কমেন্ট করছে দেখে গোলঘাট বোঝার চেষ্টা করতাম। আমাকেও তো টিকে থাকতে হত বাজারে।

চিত্রগুপ্ত- তার মানে টিকে থাকার জন্য আপনি ফেসবুক করতেন। আর ভাল লেখাগুলো চুপি চুপি টুকতেন?

কবি- না স্যার টুকবো কেন। ভাল লেখাগুলো বাদ দিতাম। মানে কবিতার নিয়মই হচ্ছে যা একবার লেখা হয়ে গেছে তা আর লেখা যাবে না।

চিত্রগুপ্ত- ভাল লেখা বাদ দিতে দিতে আপনার লেখায় কী পড়ে থাকত?

কবি- যা থাকত সেটাকেই কবিতা বলে চালাতে হত নাহলে তো আমার লেখা টিকবে না স্যার।

চিত্রগুপ্ত- পাঠকের কাছে কখনো জানতে চেয়েছেন আপনার লেখা ভাল লাগছে কিনা?

কবি- না স্যার আমার লেখাই যে ভাল সেটা বোঝানই আমার মোটো ছিল।

চিত্রগুপ্ত- আচ্ছা আপনি তো বেশ পরিচিত ছিলেন পাঠক মহলে তাহলে নিজের সমালোচনা শুনতেন?

কবি- মাথা খারাপ, গাল মন্দ খাব নাকি! আর সমালোচনা শুনতে হয় বলতাম ঠিকই কিন্তু সমালোচক যত কম হয় মনে মনে তাই চাইতাম।

চিত্রগুপ্ত- আপনি তো বিভিন্ন সভা, মোড়ক উন্মোচন, কবিতা পাঠ এ যেতেন তা থেকে আপনার প্রাপ্তি কী?

কবি- প্রাপ্তি অনেক তবে মেইন ছিল তরুণরা আমাকে সাথে নিয়ে ছবি তুলত।

চিত্রগুপ্ত- আপনার পাশে ছবি তুলে তারা ফেসবুকে নিজের একটা প্রচার পেত বলছেন?

কবি- আজ্ঞে না। প্রচার হত আমার। অনেক সময় আমিই বলে দিতাম ট্যাগ কোরো কিন্তু।

চিত্রগুপ্ত- মাই লড।

যম নোট করতে শুরু করলেন।

জমালয়ে অন্ধকার নেমে এসেছে। অন্ধকারের স্তব্ধতায় শাস্তির আর্তনাদ বহুদূর পর্যন্ত ছড়িয়ে যাচ্ছে। চারিদিকে নিয়ন বাতি জ্বলে উঠেছে। মেঘের সুড়ঙ্গের ভেতর এতো প্রকোষ্ঠ যে কোথায় কোন বিভাগের শাস্তি হচ্ছে কিছুই বোঝা যাচ্ছে না। বিচারালয়ের এক কোণে কফিসপ। তার পাশেই পানশালা। পানশালার ভেতর থেকে ডিজের আওয়াজ আসছে। বিচারাধীন কবি কাঠগড়ায়। একটুখানি বিচার স্থগিত রেখে যম ও চিত্রগুপ্ত কফি নিতে গেলেন। সভাসদরা পানশালায়।

কয়েকজন প্রহরী কবিকে পাহারা দিতে লাগল। কিছু তরুণ তরুণী হইহই করতে করতে ডিজে থেকে বেরিয়ে এলো। চকচকে চেহারা দেখে মনে হচ্ছে স্বর্গ থেকে ডি জে দেখতে এসেছিল। তারা কবির দিকে তাকিয়ে খিলখিল করে হাসল তারপর ফিসফিস কী সব বলতে বলতে বাইরে চলে গেল। কবির মনে পড়ে যাচ্ছে কফিহাউসের কথা, আড্ডার কথা, সেখানে প্রজাপতির মত উড়ে আসা তরুণী কবি, পাঠকদের কথা, যারা ঘিরে থাকত, সই নিত। আজ কেউ নেই। তেষ্টায় প্রাণ ছটপট করছে কবির। পানশালার দিকে তাকিয়ে ঢোক গেলেন কবি।

হঠাৎ নজরে পড়ল পানশালার পাশে একটা অন্ধকার প্রকোষ্ঠ। কবি দেখলেন ফুটন্ত তেলের থালাতে একটা রুপোর পাত্র। তাতে কী যেন একটা ফুটছে। ধোঁয়া উঠছে। আর একজন হাত পা বাঁধা অবস্থায় পাত্রটায় জিভ দেবার চেষ্টা করছে। কিন্তু যতবার জিভ এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে গরম পাত্রে জিভ ঠেকে যাচ্ছে আর আর্তনাদ করে সরে যাচ্ছে লোকটা। পেছনে দুজন পেয়াদা চাবুক নিয়ে দাঁড়িয়ে, যেই মুখ সরিয়ে নিচ্ছে ওমনি দু চাবুক মেরে বলছে খা ...খা। আবার ঠেকাচ্ছে। আবার চিৎকার।

কবি এই দৃশ্য দেখে থাকতে না পেরে পাহারারত এক প্রহরীকে জিজ্ঞাসা করলেন এটা কী হচ্ছে?

প্রহরী- উনিও আপনার মত এক কবি। যিনি পুরস্কারের লোভে হেন কাজ নেই যে করেন নি। এমনকি নিজের বন্ধু সৎ কবিকেও ল্যাং মেরে পুরস্কার হাতিয়েছেন। ওই যে রুপোর পাত্রটা দেখছেন ওটাই ওনার স্মারক। ওতে গরম জল আছে। ওঁকে তিন দিন জল খেতে দেওয়া হয় নি।

বিচার পর্ব ২

যম- তাহলে শুরু করা যাক চিত্রগুপ্ত?

চিত্রগুপ্ত- মাই লড।

বিচার পুনরায় শুরু হল।

চিত্রগুপ্ত- এবার একটু অন্য প্রসঙ্গে আসি। আপনি তো প্রায় অর্ধশতক লেখালেখি করেছেন। আপনার মধ্যে দেশাত্মবোধ কখনো জাগ্রত হয়েছে? দেশ ও স্বাধীনতা সংগ্রামের বীর ইতিহাস নিয়ে কিছু লিখেছেন?

কবি- লিখিনি যে তা নয়। একেবারে প্রথম দিকে কিছু লিখেছিলাম, তারপর দেখলাম পাঠকরা এইসব ব্যাকডেটেড ভাবতে লাগল, দেখলাম বিদেশের বিষয়বস্তু একটু সাজিয়ে গুছিয়ে নিজের মত লিখলে আলাদা একটা মাত্রা পাচ্ছি, মর্তে অনেকে এখনো মনেই করে না যে আমরা স্বাধীন তাই ওই সব লিখলে একঘর হয়ে যাচ্ছিলাম।

চিত্রগুপ্ত- আপনি নিজে কী মনে করেন?

কবি- আমি তো মনে করি স্বাধীন। এই যা ইচ্ছে লিখছিলাম যা ইচ্ছে পরছিলাম খাচ্ছিলাম ঘুরছিলাম।

চিত্রগুপ্ত- তাহলে আপনি মনে করেন এগুলোই স্বাধীনতা তাই তো?

কবি- না ঠিক তা না মানে নিজের মত সুস্থ ভাবে বেঁচে থাকাটাই তো স্বাধীনতা।

চিত্রগুপ্ত- অর্থাৎ আপনি নিজে ভালভাবে বেঁচে থাকলেই স্বাধীনতা। তার জন্য আপনি একটিও প্রতিবাদ একটিও বিরোধ লেখা লেখেননি?

কবি- এই তথ্য ঠিক না স্যার আমি অনেক প্রতিবাদী লেখা লিখেছি।

চিত্রগুপ্ত- আর সেইসব প্রতিবাদী লেখার জন্যই আপনি অনেক উপহার উপঢৌকন পেয়েছেন?

কবি- এ তো স্যার বরাবরই হয়ে আসছে। কবিকেই এগিয়ে আসতে হয়। কবিদের অনেক ফ্যান থাকে। রাজনীতিকরা কবি লেখকদের ব্যবহার করেন এবার যে সেই সুযোগ নিতে পারল সময় তার, এখানে আমার দোষ কোথায় হুজুর?

চিত্রগুপ্ত কিছু একটা বলতে যাচ্ছিলেন এমন সময় এক পেয়াদা রুদ্ধশ্বাসে উপস্থিত

পেয়াদা- যমরাজ, ক্ষুদিরাম বসু হাসি মুখে ফাঁসির শাস্তি নেওয়া শেখাতে শেখাতে এক কবিকে দেখে ভয়ঙ্কর রেগে এদিকেই ছুটে আসছেন।

যম- সে কী হে! হাতে বোমা নেই তো?

পেয়াদা- না হুজুর তবে ফাঁসিকাঠ আছে।

বলতে বলতে বন্দেমাতরম ধ্বনিতে কয়েকজনকে সাথে নিয়ে বিচারালয়ে ঢুকে পড়লেন ক্ষুদিরাম বসু।

যম- কী হয়েছে ক্ষুদিরামবাবু এত উত্তেজিত কেন?

ক্ষুদিরাম- যমরাজ, শেষে কিনা এক কবিকে হাসি মুখে ফাঁসি পরা শাস্তি নেওয়া শেখাতে হবে, যে কবিরা লেখে 'পাশের বাড়ির ছেলে হোক ক্ষুদিরাম'।

কবি- উনি তো আপনার প্রতি শ্রদ্ধাতেই ব্যঙ্গ করে ওই লেখা লিখেছেন।

ক্ষুদিরাম- আপনি কে?

কবি- আমি একজন কবি।

চিত্রগুপ্ত - এনার আজ বিচার চলছে।

ক্ষুদিরাম- তাই বলুন। মুখচোখ দেখেই বুঝেছি। এই কবি নিশ্চয় দেশের জন্য এক কলমও খরচা করেনি। যা করেছে নিজের জন্যই করেছে।

কবি- হ্যাঁ আমি নিজের জন্যই করেছি। কিন্তু হে বরেণ্য একটু ভাবুন দেশের প্রতিটি মানুষ যদি নিজের জন্য ভাবে তাহলে তো দেশেরই উন্নতি হবে। বিন্দু বিন্দু করে সিন্ধু।

ক্ষুদিরাম- ভাববেন না আমি কবিতা বুঝি না, বিন্দু বিন্দু করে সিন্ধু দ্ব্যর্থক। আপনার মত প্রতিটি মানুষ যদি নিজের জন্য ভাবতে শুরু করে তাহলে এক বাটি করে জল মিশতে মিশতে জলের সিন্ধুতে পরিণত হবে। আর আপদের মত বুদ্ধিজীবীরাই নিজেদের কবিতা সিলেবাসে বেশি বেশি ঢোকাবার জন্য দেশাত্মবোধক কবিতাগুলোই লুপ্তপ্রায় করে ফেলেছেন, শুনলাম রবিঠাকুরকেও বাদ দেবার কথা ভাবা হচ্ছে। আর থাকলটা কী তাহলে মশাই! একটা রবি ভেঙে এত বছর খেলেন এখন যেই দু-চারটে বিদেশী টুকলি করতে শিখে গেছেন এখন বলছেন আর দরকার নেই!

কবি- না না ওটা রাজনৈতিক ব্যাপার।

ক্ষুদিরাম - প্রতিটা শতকেই কবি লেখকরাই গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ভূমিকা নিয়েছেন। কিন্তু এখন তো আপনারা নিজেদের স্বার্থে সেই ভূমিকা নেভাচ্ছেন। কিছু কবি মৃত্যুর পর কীভাবে পাঠকের কাছে জীবিত হচ্ছেন? আর জীবিত কবিরা মৃত্যুর পর দ্রুত মারা যাচ্ছেন কী করে? এই ভ্রম পাঠকের মনে আপনাদের মত সুবিধাবাদী কবিরাই যুগিয়েছেন। আপনাদের আমি হাসতে হাসতে শাস্তি ভোগের ট্রেনিং দেব!

আমি দেশের জন্য জীবন বলিদান দেবার পর কয় জন কবি লিখেছিলেন? ভাগ্যিস লোককবিরা ছিলেন। বাঁকুড়ার লোককবি পীতাম্বর দাস 'একবার বিদায় দে মা' না লিখলে তো আমি বেঁচেই থাকতাম না। আর আপনারা আপনাদের পশ্চাতে বাতাস করা তরুণ কবিদের গডফাদারের মত শেখালেন 'বার খেয়ে ক্ষুদিরাম হও না'।

সভাসদরা এ ওর মুখ দিকে তাকাতে থাকেন। কবি চুপ।

চিত্রগুপ্ত বললেন 'আমার আর কিছু এই সেশনে বলার আছে কী মাই লড?'

যম- না। কাল আবার শুনানি হবে।

পর্ব ৩

পরদিন আবার বিচার শুরু হল। কবি যমালয়ের কাঠগোড়ায় দাঁড়ালেন। চিত্রগুপ্ত হাতে বেশ কয়েকটা পুজো সংখ্যা নিয়ে হাজির।

চিত্রগুপ্ত আজ আমার হাতে বেশ কিছু ব্যবসায়িক ও লিটল ম্যাগাজিন আছে যেগুলিতে আপনার লেখা আছে। সংখ্যাটা প্রায় ১৭!

কবি- হ্যাঁ ঠিক কথা স্যার।

চিত্রগুপ্ত- আপনি এক পুজোতে এতোগুলো লিখেছিলেন?

কবি- আজ্ঞে।

চিত্রগুপ্ত- আপনি কি মনে করেন সব কবিতার মান সমান ছিল?

কবি- না তা কখনো হয়। কবিতা কখন কী রকম বের হয়। আবার তাড়া থাকলে তো!

চিত্রগুপ্ত- তাড়া?

কবি- পুজো সংখ্যার জন্য সব পত্রিকাই তাড়া দেয়। আমরটা হল, তাড়াতাড়ি দিন প্রেসে যাবে ইত্যাদি। তাই পুজো সংখ্যায় যতটা পারা যায় গোঁজামেল, জনপ্রিয়, সার শূন্য লেখা দিয়েই চালিয়ে দিতে হয়।

চিত্রগুপ্ত- সততার কাছে বিবেকের কাছে কিছু মনে হয় না?

কবি- না। কারণ বেশিরভাগ পাঠক ওগুলোই গ্রোগ্রাসে গেলে আর বাহবা দেয় তাতে আমার থেকে কোথাও ভাল সাহিত্য, কবিতা হলেও সেগুলো উঠে আসার সুযোগ কম। এই এক সুবিধে হয়।

চিত্রগুপ্ত- যমরাজ নোট করবেন, প্রতিষ্ঠিত কবি হিসেবে এই কবি নিজের সততা ও বিবেকের কাছে আত্মবিসর্জন দিয়ে উৎসবের আবহে বছরের পর বছর পাঠক ঠকিয়ে গেছেন।

যম নোট হল।

চিত্রগুপ্ত- আচ্ছা আপনি তো কবিতা পাঠ করতে বিভিন্ন মঞ্চে যেতেন বলেছিলেন। কখনো কবিতার শরীর ছাড়িয়ে কবিতায় ঢুকতে পেরেছেন নাকি আমন্ত্রণ পত্রে নিজের নাম আর মঞ্চের আসনে বিশিষ্ট কবি সাহিত্যিকদের আলোয় শুধু কবিতার শরীর রাঙিয়েছেন?

কবি - দেখুন সত্যি কথা বলতে কী কবিতা পাঠ কেউ শুনতে যায় না। আর পড়ার ব্যাপারটাও তাই। একটু যোগাযোগ, পরিচিত, হইচই এইসব আর কী। এমনিতেও বেশিরভাগ কবিতা পাঠের সভাঘরে কবিরাই থাকেন পাঠক তেমন কই আসে। সেইজন্য আমি ঠিক নিজেও জানি না কবিতার শরীর অতিক্রম করে কবিতায় ঢুকতে পেরেছিলাম কিনা।

চিত্রগুপ্ত মাই লড কবিতার উপরে এক শরীর থাকে ভেতরে তার নির্যাস। কবিতা পাঠে শরীর অতিক্রম করে সেই নির্যাস পর্যন্ত পৌঁছালে তবে কবিতা পাঠের আসর সার্থক। কিন্তু মর্তে সেই আসর যখন একটা ছল মাত্র সেখানে কীভাবে সেই নির্যাসে পৌঁছানো যায়!

এ প্রসঙ্গে আপনি যদি অনুমতি দেন তবে নরক সভাসদ ও বিচারাধীন কবিকে পুণ্যলোভা ও পাপলোভীর কথা শোনাতে চাই।

যম- অনুমতি দিলাম।

চিত্রগুপ্ত গল্প শুরু করলেন।

পুণ্যলোভা ও পাপলোভী নামে এক কবিপত্নী ও কবি ছিলেন। কবি কবিতা লিখতেন। সারাদিন তার কোনও কাজকর্ম ছিল না। ছিল না বললে ভুল হবে কাজ তিনি করতে চাইতেন না। কবিতা নিয়েই তার বেশিরভাগ সময় অতিবাহিত হত। তবে পুণ্যলোভা এ ব্যাপারে মাথা ঘামাত না। শর্ত ছিল প্রতি রবিবার পাপলোভী যেন তার কাজে হাত বাটায়। তাই পাপলোভী নিয়ম করে শনিবার নিজের সব কাজ সেরে রবিবার পুণ্যলোভার কাজে হাত বাটত।

পুণ্যলোভা, পাপলোভীর কবিতার নির্যাস ছিল। কিন্তু পুণ্যলোভা চাইত কবি অন্য কিছু লিখুক, প্রয়োজনে অন্য নারীর কথা লিখুক কিন্তু কোনও ভাবেই যেন তার কথা কবিতায় না লিখে। অথচ পাপলোভী লিখতে গেলেই পুণ্যলোভার কথা লিখে ফেলত।

- তোমার অবস্থাটা বুঝছি পাপলোভী। কী করবে বলো বিয়ে তো একবারই হয়। তবে এভাবে তোমার কবিতাকে নস্যাৎ করে দেওয়াটাও একেবারে ঠিক না। হাজার হোক তুমি তো পুণ্যলোভাকে নিয়েই লিখছ।

পাপলোভীর এলোমেলো লাগছে সব। সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠে বৌ এর প্রায় সব কাজ সেরে দুপুরে এসেছে বন্ধু প্রয়াগ এর কাছে। প্রয়াগ পুরানো অ্যালবামগুলো ঘেঁটে দেখছে। দশ বছরে প্রয়াগ একটাও কবিতা পাঠ করেনি। বলা যেতে পারে ইচ্ছে করেই যায় নি। শুধু দীপার জন্য কবিতা ছেড়ে দিয়েছে। দীপা প্রয়াগের প্রেমিকা। বিয়ে করেনি এখনও, তবে প্রায় এগারো বছর লিভ টুগেদার করছে। শুরুর দিকে কবিতা নিয়ে কোনও অনীহা না থাকলেও পরে প্রয়াগের নিয়মিত কবিতা আসরে যাতায়ত নিত্য নতুন কবিবান্ধবীর সাথে বার্তালাপ, দীপা প্রায় বাধ্য করেছে প্রয়াগকে কবিতা ছাড়া করতে। একজন কবিতা ছাড়া আর একজন কবিতা প্রায় যেন ছাড়ার মুখে। দুজনের বন্ধুত্ব তাই আরও বেড়ে গিয়েছে।

মাঝে মাঝে সময় পেলেই প্রয়াগের ফ্ল্যাটে চলে আসে। দীপাও জমিয়ে আড্ডা দ্যায় তবে পুণ্যলোভা আর পাপলোভী নাম দুটো নিয়ে প্রায় ইয়ার্কির ছলে হাসি ঠাট্টা করে। এটুকুই ভাল লাগে না পাপলোভীর। বাদ বাকী ফ্ল্যাটটা শান্তির।

সে যাই হোক প্রয়াগের কিন্তু কবিতা লেখার বাসনাটা এখনো রয়ে গেছে। দীপা যদি পুণ্যলোভার মত কবিতাটা লিখতে দিত তাহলে না হয় ওর কিছু কাজ করেই দেওয়া যেত।

দুজনের কথাবার্তা চলতে চলতেই দীপা কফি নিয়ে আসে। তারপর সোফায় বসে বলে 'পাপলোভীদা মানপত্র খেয়ে খেয়ে তুমি তো দেখছি মোটা হয়ে যাচ্ছ, তুমি তো ড্রিঙ্কও করো না!

আজ আমাদের বিকেল দিকে প্রোগ্রাম আছে চলবে নাকি একটু?'

প্রয়াগও সাথে সাথে বলে হ্যাঁ হ্যাঁ আজ একটু জমিয়ে খেয়েই যাস। পাপলোভী কোনও উত্তর করে না।

দীপার মোহময় আবেদনে কবিতা ফুটতে থাকে পাপলোভীর মনে। ফ্ল্যাট বাড়িতে সবসময় শিরশিরে একটা ঠাণ্ডা তার উপর দীপার হটপ্যান্ট , স্লিভলেস এসব যেন পাপলোভীর কল্পকাব্য। যতবার প্রয়াগের বাড়ি এসেছে ততবার ফিরে যেন দীপাকেই লিখতে চেয়েছে, কিন্তু পুণ্যলোভার অবয়ব কবিতার মত প্রাচীর হয়ে গেছে পাতার দেয়ালে।

পুণ্যলোভা এক বর্ষার ছাতা ঢাকা মাটি। ছাতার চারপাশ কাদা তো হয় কিন্তু ছাতার নীচে দাঁড়িয়ে থাকা পাপলোভী ভিজতে পারে না। পাপলোভী কাদা হতে চায়। বর্ষার ছাতা ছিঁড়ে উড়তে চায় বাতাসে। দু চার রাস্তা টপকে ভেসে যেতে চায় স্মরণিকায়। ওখানে শ্যাওলা রঙের কবিমূর্তি দাঁড়িয়ে আছে। তার পায়ে ঠোক্কর খেতে খেতে উপাসনায় নাম লেখাতে চায়। নির্বাসন দিতে চায় নিজের শরীরকে। লোভ লোভ কবিতার শরীরের লোভ, আ-মঞ্চ খুলে ফেলার লোভ।

প্রতিটা বিন্দু ছিনিয়ে নেবার লোভ, প্রতিটা কবিতা যোনিকে ঠোঁটে তুলে চুম্বনের লোভ। পাপলোভী এক দুর্বল লিঙ্গের মত খাড়া হতে থাকে। তারপর দীপার আধ পড়া টেবিলে খুলে রাখা বইয়ের ক্লিভেজের দিকে তাকিয়ে বলে আজ এক পেগ খাব।

দীপা এক সুস্ত সচেতন কবিতার শরীর। তার অবয়বটুকু দিন প্রতিদিন নিগড়ে নিয়েছে প্রয়াগ। অথচ দীপা তা চায় নি। দীপা নগ্ন হতে চেয়েছে, হাড় রক্ত কঙ্কালের শরীরে। কবিতার প্রতিটা যাপনে খুলে দিয়েছে অন্তর্বাস, এমনকি দুপায়ের মাঝের ব্ল্যাকহোলটুকুও। নাভি বেয়ে কোনও কবি উঠে আসেনি বাম বুকের ভেতর। শুধু বুকে মুখ ঘষে মাতাতে চেয়েছে শরীরে। প্রয়াগকে তাই তার কবি বলে মনে হয়নি। ঘেমে যাওয়া শরীরের সব নুন ফুটে ওঠে, প্রয়াগ তার দাম মেটায় নি।

কবিতা ছেড়েছে ঠিকই কিন্তু ওর খোঁজ এক ঢেকে থাকা কবিতার শরীর। দীপা জন্ম থেকেই মুক্ত। কোনও পোশাকই তার পরতে মানা নেই, নিজেকে বুঝিয়েছে কবিতার কোনও পোশাক হয় না বরং পোশাকি কবিতার শরীরের প্রতি লোভই দীপাকে বাধ্য করেছে প্রয়াগকে কবিতা ছাড়া করতে। পাপলোভীদা কে দীপার ভাল লাগে। লাজুক চেহারার পাপলোভীর মধ্যে কবিতার লকলকে গ্রাস। পাপলোভী ফ্ল্যাটে এলেই দীপা নিজেকে আরও এলোমেলো, খোলামেলা করে দ্যায় ও চায় পাপলোভী শরীর ছাড়িয়ে কবিতায় ঢুকে যাক, পূর্ণতা পাক কবিতা।

পাপলোভী ডাকছে কুহু। কেউ তাকে শুনতে পাচ্ছে না। মগডালের উপরে চাঁদ। দু এক সারি গাছ তার উপর পাপলোভীর মতন দেখতে আরও কিছু পাখি। চিল শকুন হতে পারে। পুণ্যলোভা ভিজে কাপড়ে হেঁটে যাচ্ছে গাছের তলায়। এই জায়গাটা পরিষ্কার লাগছে। নিজের মনে বিড়বিড় করতে থাকে। আজ আমি কবিতা পাঠ করব। এই গাছেদের ভিড়ে, চিল শকুনের ভিড়ে। স্তব্ধ হও পোশাক। তোমাকে খুলে পড়তে পারেনি সে। বলতে বলতে খুলে ফেলে থ্রি কোয়াটার হাত ব্লাউজ। এই রাখ তোর পুরস্কার, জোড়া কাপ দিলাম, বলে খুলে ফেলে অন্তর্বাস । তারপর একে একে সব। গাছের উপর থেকে পাপলোভী দেখছে। তার কোনও শরীর নেই। তবু সে দেখছে। লাল চোখ। কুহু। পুণ্যলোভা শুরু করে পাঠ, আকাশ বাতাস জুড়ে। খসে পড়ছে মাংস, শিরা, হাড়...একটা হৃৎপিণ্ড একা বনে ধুক পুক, ধুক পুক। ওর শরীর সেই বিকেলে শেষ হয়ে গেছে আগেই। ও পরের স্তবক শুরু করে। জোরে আরও জোরে। মগডালে তখন আরও এক কুহু উড়ে আসে। দু জোড়া লাল চোখ। এই প্রথম শরীর ছাড়া কবিতার পাঠ শুনছে। শূন্য মাত্রার গল্পের মত শীতল হয়ে উঠছে বুনো কবিতার শরীর।

চিত্রগুপ্ত বলতে থাকেন, মাই লড সেই দু জোড়া লাল চোখে নরধানী লঙ্কার গুঁড়ো আপনারই আদেশে চব্বিশ ঘণ্টা ছোঁড়া হচ্ছে।

- হ্যাঁ মনে পড়ছে সেদিনের সেই রায়দানের কথা। চিত্রগুপ্ত আপনি বিচারের কাজ এগিয়ে নিয়ে চলুন।

মর্তলোক পর্ব ১

কবিতা সভায় লোকটিকে নতুন দেখে পরিচয় সারতে নিজেই এগিয়ে আসে অনুরাগ। অনুরাগ সদ্য লিখতে আসা তরুণ কবি। কয়েকটি পত্রিকায় লেখা বেরিয়েছে। আজ ডাক পেয়েছে সুশীল কবিতা পত্রিকার অনুষ্ঠানে। পাঠ শেষে ঝোলা কাঁধে একপাশে দাঁড়িয়ে থাকা ভদ্রলোককে দেখে তার মনে হল কোনও সিনিয়র কবি হবেন হয়তো। তাই যেচেই এগিয়ে গেল পরিচয় করতে।

- দাদা আপনি কোথা থেকে এসেছেন?

- আমি, আচ্ছা। আমার তো ঠিকানা কিছু নেই। কবিতা, কবিতার লোকজন এইসব দেখলে আমি সেখানে চলে যাই।

- আপনি লেখেন?

- লিখতাম। এখন আর লিখি না তোমাদের মত তরুণদের পড়ি। তা পাঠ করলে?

- হ্যাঁ দাদা করলাম। কিন্তু করেই আর কী যে হবে!

- কেন?

- চলুন না আমরা চা খেতে খেতে কথা বলি।

- হ্যাঁ চলো।

চা নিয়ে বলতে থাকে অনুরাগ ' দাদা সত্যি বলতে কী আমি আর তরুণ কোথায় ৩৫ বয়স হল, আমাদের মত বয়সে আর কিছু হবার সুযোগ নেই।

- কেন কেন?

- দাদা সত্যি বলব? দেখুন সাধারণত ত্রিশ বছরের নীচের কবিদের চেলা হিসাবে গ্রহণ করতে চায় বড় কবিরা। কবিরা জানে এই বয়সের উপরে মাথা পক্ব হয়ে যায়, তাদের মাথা ধোয়া বা হাত বোলানো যায় না। অশিক্ষিত ও শিক্ষিত কিম্বা সমাজে প্রতিষ্ঠিত কবি প্রত্যেকেই কবি হিসাবে আলাদা প্রতিপত্তি চায়। তারা চায় নেতা বা ফিল্মি অভিনেতা অথবা ডি এম এর মত প্রশাসনিক নাই হোক তরুণ চেলা কবি ও পাঠকদের কাছে ঘিরে থাকার স্টারডাম। অথচ দুটি কী পাঁচটি চেলা কবি সেই স্টারডাম দিলে তারা ধন্য ধন্য হয়ে ওঠে এতোটাই ঠুনকো হয় তাদের কবিভাব। আর জনগণ তাদের হরিদাস পাল বলেই মনে করে। এর পিছনে গোটা কবিসমাজই দায়ী। কিন্তু দায়ীই বা কিভাবে বলি!

আজ গোটা কবি সমাজই জানে যে তারা কেউই কবি নন, ভান করে যাচ্ছেন। তা না করলেও উপায় নেই, কেউ কাউকে এক চুল জায়গা ছাড়ে না। কম্পিটিশন এর বাজার। অর্থাৎ সেই বাজারেই ঢুকে পড়েছেন কবি। সাধনা যখন বাজারি হয়ে যায় সেখানে ভক্ত আর থাকে না থাকে স্বার্থসিদ্ধির লোকজন। তাই কবির পিছনে ঘুরে ভাল কবি তৈরি হওয়া তো দূর অস্ত বরং বেনোজল অকবি ধান্দাবাজরাই ঢুকে পড়েছে সেখানে।

এইগুলি যে সকলের অগোচরে ঘটছে তাও না। সকলেই সবকিছু জানে। কবি শব্দটি আসলে সমাজে এখন এনডেঞ্জার।

- কিন্তু সমাজে কবির তো একটা আলাদা স্থান আছে এটা তো মানতেই হবে?

- দেখুন কবি হিসাবে মানুষ যে বাহ্যিক ও অন্তর রূপ মনে ধারণ করে রেখেছে তা আর নেই। কাজেই যারা লিখছে তাদের প্রতি অন্য সব সমষ্টির মতই ধারণা আসছে আর কবি তা এখনও না বুঝতে পেরে আরও বেশি সামনে ও পিছনে অসম্মানিত হচ্ছেন। যা তিনি নিজের প্রফেশনটি নিয়ে বিরাজ করলে হয়তো হত না। আসলে কবির সামগ্রিক চিত্রটা অবলুপ্তের পথে। কবি নামটা যে একটা বৃহৎ ও বর্তমানে তা হওয়া আর সম্ভব না।

- তবুও কবিতা তো একটা সাধনা। সাধনা না করে তো সফলতা সম্ভব না?

- হা হা হা। সফলতা বলছেন, আমি তো মনে করি কবিতার সাধনা না করেও যদি শুধু ফেসবুক সাধনা করা যায় তাহলেই এখন বোঝা যায় অমুক পত্রিকায় কার লেখা ছাপবে, অমুক উৎসবে কে কে ডাক পাবে, অমুক সম্মাননা বা অমুক পুরস্কার পরের বার কে পাচ্ছেন। কে কার বইয়ের সাধুবাদ জানাতে চলেছে কিছুদিনের মধ্যেই। কে কাকে কবিতাগুরু স্বীকার করতে চলেছে । কার কবিতায় অমাবস্যা এলো কারই বা পূর্ণিমা চলছে। কে শুক্লের পক্ষে কেই বা কৃষ্ণের পক্ষে। কার এখন কবিতায় একাদশী আর কার কবিতায় উঠে আসছে অন্নপ্রাশনের ভাত।

বিচার পর্ব ৪

- এবার আমি এমন কিছু নথি আপনার সামনে পেশ করতে চাই যা দেখে আপনি বিস্মিত হবেন এমন কী বিষমও খেতে পারেন।

- পেশ করা হোক।

- মাই লড এই হল গত পাঁচ বছরে বিচারাধীন কবির কবিতা পাঠের আমন্ত্রণ পত্র, সম্মাননা পোস্টার, ও বিভিন্ন পত্র পত্রিকার সূচিপত্র যেখানে উনি লিখতেন।

- এর মধ্যে আশ্চর্যের কী আছে? উনি একজন প্রতিষ্ঠিত কবি হিসাবে বিভিন্ন কবিতাসভা অনুষ্ঠানের আমন্ত্রণ পাবেন তাতে সম্মাননা পাবেন আর সূচিপত্রে ওনার নাম থাকবে এই তো স্বাভাবিক।

- নিশ্চিত ভাবেই তাই মহামান্য বিচারক, কিন্তু আমি আপনার দৃষ্টি একটু অন্যদিকে ঘোরাতে চাই ।

এই বলে চিত্রগুপ্ত যমরাজের কাছে গিয়ে নথিগুলি হাতে তুলে দিলেন তারপর কবির দিকে তাকিয়ে বলতে শুরু করলেন।

- মাই লড ভালভাবে লক্ষ করুন বিচারাধীন কবির পাশাপাশি অন্যান্য কবির নামগুলি। মাই লড দেখুন প্রতিটা জায়গায় একাধিক একই নাম আপনি দেখতে পাবেন, আবার সম্মাননা পোস্টারেও দেখুন ওই একই নাম, পাঠ আমন্ত্রণ পত্রে দেখুন ওই একই কিছু নাম বারবার। শারদ সংখ্যাগুলো দেখুন সেখানেও একই ব্যাপার।

যম পাশের করণিকের দিকে তাকিয়ে বললেন আচ্ছা বাংলায় এখন কত কবি আছে?

- মহামান্য, জেলা মহানগর মিলিয়ে সংখ্যাটা প্রায় ১০২৯০।

- এখানে তো ওই ৫০-৭৫ টি নাম ঘুরঘুর করছে দেখছি।

চিত্রগুপ্ত- একদমই তাই। মর্তে কবিতার চক্র গড়ে উঠেছে। আর এই বিচারাধীন কবি সেই কবিতাচক্রেরই এক অংশ। ইনি নিজ গণ্ডির অন্তর্গত কবিদের বার বার সুযোগ করে দিয়ে গ্রাম বাংলা জেলা এমনকি মহানগরীরও বহু যোগ্যতাধারী কবিদের তাদের প্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত করেছেন। ইতিহাসের পাতায় শুধু নিজেদের নাম ই রাখতে চেয়েছেন। এ এক ঘোর অপরাধ।

সৃষ্টিতে 'কর্মেই তোমার অধিকার ফলের উপর কোনও অধিকার নেই' শ্রীহরির এই বার্তা কবিমনে ভুল ভাবে ব্যক্ত করেছেন।

- চিত্রগুপ্ত, শ্রীহরি গতকাল কিছু নথি পাঠিয়েছেন। ওদিকে কৈলাস থেকে মহাদেব মা সরস্বতীকে নিয়ে আসছেন বিচার দেখতে আর মা সরস্বতীর উপস্থিতি মানেই স্বয়ং ব্রহ্মার পদার্পণ। ত্রিদেব এর এই সংকেত আমার মোটেও ভাল ঠেকছে না। তবে কী সৃষ্টির কোনও বিশেষ পরিবর্তন সম্মুখে? কী জানি! কবির বিচারে আরও বিশদ তথ্য প্রয়োজন হয়ে উঠছে।

- কী তথ্য চাইছেন বলুন মান্যবর? আমি আমার যথাসাধ্য চেষ্টা করব।

- তাহলে আমাকে একটু সমগ্র কবি ও কবিতার ইতিহাস বিচার পরিপ্রেক্ষিতে পেশ করা হোক।

- যথা আজ্ঞা।

চিত্রগুপ্ত- মাই লড সে এক বহু পুরানো ইতিহাস। ইন্টারনেট সোশ্যাল মিডিয়া আসার আগে লেখালেখি জগতের মানুষরা সম্পূর্ণ গুলতানি মেরে এসেছেন যে এটি একটি ভীষণ কঠিন কাজ। মৌনতা। কেউ কেউ পারেন। ইত্যাদি ইত্যাদি।

আসলে তা ছিল না মাই লড। গুটিকয় মানুষ যাদের কাজ কম্ম ছিল না, ছিল বেকারত্বের জ্বালা, ছিল অঢেল টাকা পয়সা, ছিল প্রচুর সময়, ছিল ভীষণ খুশি, ছিল খুব দুঃখ, ছিল মাথায় গড়বড় তারাই কয়েকটি দলে এই কাজ শুরু করেন।

তা থেকে সামান্য উপার্জনও করতে থাকেন, আর কিছু মনুষ্য অধিক টাকা খরচেরও সুযোগ পান।

তারা ভাল করেই জানতেন সমাজের সব স্তরের মানুষ যদি এই কাজ শুরু করে তাহলে তাদের অস্তিত্ব বিপন্ন হবে। তাই লেখালেখিকে নিজেদের কুক্ষিগত করে রাখতে বহু রকমের ছল চাতুরী তখন থেকেই শুরু হয়।

বড় মেজ সেজ লেখক, তাদের সাঙ্গ পাঙ্গ চেলা ইত্যাদি তৈরি হয়। সাধারণ মানুষ নিজেদের কাজ পড়াশুনো চাকুরী সংসার নিয়েই ব্যস্ত থাকেন। একপ্রকার বাধ্য হয়েই এদের লেখা গিলতে থাকেন। তাদের মনেও হয় এটা আমিও পারতাম লিখতে কিন্তু সেটা করার বা প্রকাশের সুযোগ তাদের ছিল না। ওই জায়গাটা গুটিকয় দখল করে রেখেছিল।

কম্পিউটার ও ইন্টারনেট আসার পর বিশেষত স্মার্ট ফোন ও সোশ্যাল নেটওয়ার্ক যখন এলো তখন সাধারণ মানুষ লেখা শুরু করল। লেখালেখি জগতে তখন এক ডঙ্কা বাজার অবস্থা।

এবং যা ভাবা হয়েছিল তাই হল, বেশিরভাগই লিখতে পারছে এবং অনেক বাস্তব ও ওই সমস্ত লেখকের চেয়ে অনেকেই ভাল লিখতে লাগল। পাতার লেখকদের তখন একটাই উপায় ছিল আরও বেশি দল ও নিজদের হাত শক্ত করে কেবলমাত্র একে অপরকে কবি লেখক হিসাবে চিহ্নিত করা। কবিতাপাঠ ও পুরস্কারের মাধ্যমে নিজেদের অস্তিত্ব জানান দেওয়া।

কিন্তু তাতেও হল বিপত্তি এক পায় তো আর এক পায় না। ফলে আরও বেশি দল আরও বেশি নিজেদের মধ্যেই বিচ্ছিন্ন হতে থাকল। এদিকে এসব থেকে দূরে ফেসবুকের লিখিয়েরা মনের আনন্দে লিখে যেতে লাগলেন। পছন্দ হতে থাকল সমাজের, সমাজ মেনে নিলো, একে অপরের যোগাযোগ বাড়ল। পাতার কবি লেখকের থেকে দূরে সরতে লাগল। আর তো প্রয়োজনই ছিল না।

একই ধরনের লেখা যখন হাতের মুঠোয় ও নিজেই লিখতে পারছে তখন মুষ্টিমেয় কিছুদের এত কবি লেখক ভাবের তারা ধার ধারবে কেন।

এদিকে পাতার কবি লেখকের মধ্যেও তখন অর্ধ সময়ের কেরানি, অফিসার, ইত্যাদি ঢুকে পড়েছে। তারা দেখল বাহ বেশ তো দু এক ছাপা অক্ষর দেখা যাচ্ছে নিজের নমে। ধীরে ধীরে যারা সমাজে উঁচু পদ কেরানী তারা বেশি সুযোগ পেতে থাকল পূর্বের কবি লেখকের সংজ্ঞা বদলে যেতে থাকল।

তারাও সাধারণের সাথে ফেসবুকে হাত জমাতে শুরু করলেন। কিন্তু ততদিনে তাদের আর পাত্তা দেবার কেউ ছিল না, ফলত ফেসবুক থেকে আউট মানেই সে আর লেখক কবি সমাজে রইল না।

পুরাতন কয়েকটি পাকাচুল যারা পূর্বজ বহন করে আছে তারা অস্ত গেলেই গোটা ব্যাপারটি আরও পরিষ্কার হবে।

আগামীতে কেউ বলতে পারবে না আমি লিখি, পাশের জন বলবে ওটা আবার কী? আমিও লিখি তেমন কিছু ব্যাপার না।

ভাট বুঝিয়ে কয়েক দশক অন্ধ করে রেখেছিল কিছু লোকজন নিজেদের স্বার্থের জন্য যা প্রায় এবার ধূলিসাৎ হবার মুখে।

বিচার পর্ব ৫

পরবর্তী পর্যায়ের বিচার শুরু হল।

চিত্রগুপ্ত - মৃত্যুর ঠিক দু বছর আগে কবিতার জন্য বরাদ্দ সবচেয়ে বড় পুরস্কারটি আপনি পান। তার আগে অবশ্য বেশ কিছু পুরস্কার সম্মাননা পেয়েছেন।

কবি - ঠিক স্যার।

চিত্রগুপ্ত - আপনি যে পুরস্কার পেয়েছেন তা কিভাবে জানতে পারতেন?

কবি- স্যার কখনো আমার ফ্যানদের শেয়ার করা পোস্ট থেকে কখনো কর্তৃপক্ষ নিজে ফোন করে জানাত।

চিত্রগুপ্ত- আপনি আপনার ১৪ টি কাব্যগ্রন্থের মধ্যে প্রথম দিকের দু একটি বাদ দিয়ে তো প্রায় সব বইয়েই কিছু না কিছু পেয়েছেন?

কবি- ঠিক স্যার।

চিত্রগুপ্ত - আপনি এত খবর রাখতেন কী করে? কোথায় কী জন্য পুরস্কার দেওয়া হচ্ছে?

কবি- খবর তো রাখতেই হত হুজুর।

চিত্রগুপ্ত- খবর পেতেন না?

কবি- হ্যাঁ স্যার মাঝে মাঝে কিছু খবর পেতাম।

চিত্রগুপ্ত- আরও তো অনেক কবিই ছিল তারা খবর পেত না?

কবি- কিছু পেত বইকি।

চিত্রগুপ্ত- আর তাদের মধ্যে বিচারে আপনারটি সেরা নির্বাচিত হত তাই তো?

কবি- ঠিক বলেছেন স্যার।

চিত্রগুপ্ত- পুরস্কারের জন্য বই জমা দেবার বিজ্ঞপ্তি বের হত?

কবি- না সেরকম ভাবে বের হত না, বা বের হলেও তেমন কেউ জানতে পারতো না। সেভাবেই বিজ্ঞাপন দেওয়া হত। তবে বই তো জমা দিত অনেকে সেখান থেকেই..

কবিকে থামিয়ে চিত্রগুপ্ত বলতে শুরু করলেন।

মাই লড নোট করবেন এই ধরনের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যা ভবিষ্যতের তরুণ কবিদের ও বাংলা সাহিত্যের পথ নির্দেশক হবে সেই সব বই যেগুলি পুরস্কার পাবে তার জন্য আগাম কোনও বিজ্ঞাপন দেওয়াই হত না, বা কবিরা জানতেই পারতো না। কোনও পর্যালোচনাও হত না কেন পুরস্কার প্রাপ্ত বইটি অন্য জমা পড়া বইয়ের থেকে ভাল।

যখন কবির পুরস্কার দেখে মর্তে কবিত্ব মূল্যায়ন হয় তখন এই ধরনের পুরস্কারের খতিয়ান তো বিচারকদের দেওয়া উচিত?

যম- কথা ঠিক।

চিত্রগুপ্ত- আসলে এই সাহিত্যে পুরস্কার ব্যাপারটাও একটা ছক। একজন শিল্পী তার রচনার থেকে পুরস্কার প্রাপ্তিতেই অধিক সময় ব্যয় করেন। কবে কখন কোথায় কোন পুরস্কার কাকে দেওয়া হবে তা ঠিক হয়ে যায় পূর্বেই। পুরস্কার ঘোষণার পরই জানা যায় শুধু নাম। কবি লেখকরা তাঁদের মূল্যবোধ ধূলিসাৎ করে এতে সামিল হন। আর প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভাবে এমন সিস্টেমকেই সমর্থন করেন। কাজেই অন্যায় যে বা যারা করে আর অন্যায় যে বা যারা সহে আপনি জানেন তারাও সমান দোষী। এই কবিও এমন পদ্ধতি সমর্থন করে অপরাধ করেছেন।

যম- আচ্ছা ছাঁকনি সমুদায়, মানে আকাদেমিগুলো ওখানে করছেটা কী?

- মহামান্য তাঁরা নিজেরা খোঁজাখুঁজির কাজ বহু দিন হল বন্ধ করেছেন। তাদের এজেন্টরা খুঁজে আনার দায়িত্ব পালন করে থাকে। আর সেই আকাদেমি পর্যন্ত ভাল বই, ভাল কবি পৌঁছাতে গেলে আগে এজেন্ট ধরতে হয়। তাই মর্তে এজেন্টদের পোয়া বারো এখন। বুক ফুলিয়েই তাঁরা কবিতা বাজার রাজ করেন।

- নোট হল।

মর্তলোক পর্ব ২

- তুমি তো চাকরি করো বললে। এত সময় পাও কী করে? লেখালেখির জন্য তো সময় দরকার?

- ভাবার সময় হল রাত। তাই রাত জেগে লেখালেখি করি, লেখালেখির জন্য সঠিক সময়ে খাওয়া দাওয়া হয় না ,পর্যাপ্ত ঘুমও হয় না আজকাল।

- সে কী! এতে মানসিক টেনশন বাড়বে, ওটাই তো সব রোগের কারণ এখন। পরিবারকে সময় দাও কখন?

- দিই না তো। কখন দেবো? আমি জানি না এর জন্য অকালমৃত্যুবরন নাকি এক আনন্দময় যন্ত্রণামুক্ত জীবন যাপন।

আমি কী রেখে যেতে পারি! সংসার ধর্ম করা কি কবির পাথেয় ? বলুন?

এ ধর্ম যদি পালন নাই করি তবে কিসের সংসার কেনই বা গৃহত্যাগ করলাম না। তবে কি আমি পাপ করছি ? কবিতাকে সন্তানের নাম দিয়ে ধর্ম রক্ষা করছি? অথবা জগতের কল্যাণ সাহিত্যের কল্যাণ ...অনুরাগ বলতে থাকে।

কিন্তু যে মানুষ সংসারী হয়েছে তার সংসার ধর্ম পালন করাই কর্তব্য তার থেকে বড়ো সাহিত্য আর কী হতে পারে, তার থেকে বড় জগৎ আর কী থাকতে পারে। যেখানে থাকেন আমার মা, যাকে পাক দিলে পৃথিবী ঘোরা হয়। যেখানে থাকে আমার স্ত্রী, যাকে সাত পাকে বেঁধেছি। যেখানে বয়ে চলেছে আমার ঔরস আমার জেনেটিক কোড। আবহমান।

প্রতিটা লেখার পাতাতেও আমার কোড আছে বলছেন? নাকি প্রতিটা পাতায় নির্দিষ্ট সময়ের কোড আছে ? সে তো নিজে নিজে আপডেট হতে পারে না।

অথচ আমার ঔরসের কোড নিজেকে আপডেট করে নেয় সময়ের সাথে আমারই জেনেটিক কোড মিশিয়ে। তাহলে কাকে সন্তান বলছি? এক সাময়িক সুখ? অসুখ? একক সময়ের প্রতিধ্বনি? যে ধ্বনি মিলিয়ে যাবে , বার বার লুণ্ঠনে , বিভাজনে, মিউটেশনে খিচুড়ি হয়ে যাবে, আর আমার জেনেটিক কোড চিৎকার করে উঠবে দশকের পর দশক শতকের পর শতক কেন তুমি হারিয়ে গেলে অকাল হলে। বলুন উত্তর দিন ?

অনুরাগ চিৎকার করে প্রশ্ন করে। হঠাৎ আকাশ কেঁপে ওঠে। বাতাসে দিব্য ধ্বনি

"তোমার কী হারিয়েছে,

যে তুমি কাঁদছ ?

তুমি কী নিয়ে এসেছিলে

যা তুমি হারিয়েছ?

তুমি কী সৃষ্টি করেছ,

যা নষ্ট হয়ে গেছে?

তুমি যা নিয়েছ, এখান

থেকেই নিয়েছ।

যা দিয়েছ এখানেই

দিয়েছ..."

প্রচণ্ড আলোতে চারিদিক ভরে যায় । অনুরাগ তীব্র আলোতে দেখতে পায় বিশ্বরূপ, তার মুখে পৃথিবীর কোটি কোটি বই ঢুকে যাচ্ছে।।

অনুরাগ হাঁটু গেড়ে জোড় হাত করে বসে।

-তবে কি আমি আবারও যুদ্ধ করব হে পার্থ?

- না, এখন যুদ্ধ করলে শব্দের বিনাশ ছাড়া আর কিছুই সম্ভব নয় ।

- তবে তখন যে যুদ্ধ হয়েছিল?

-হ্যাঁ। সে সময় যুদ্ধেই নতুন সৃষ্টির সুযোগ ছিল শোধরানোর সুযোগ ছিল, এখন তা আর নেই, মানুষ আর মানুষেই নেই। কবি সাহিত্যিকরাও পশুতে পরিণত হয়েছে মানুষের আর মানুষের চামড়া বলে কিছু নেই।

- তাহলে উপায়?

- চিন্তা করো না। আবারও নিজেদের মধ্যে যুদ্ধ হবে। লড়াই হবে। কাদা ছোঁড়াছুড়ি হবে। এভাবেই হবে বিনাশ। তারপর নতুন সৃষ্টি। তবে এ যুদ্ধে থাকবে না কোনো অস্ত্র। কিন্তু কারণ হবে একই। লোভ, নারী, আর শ্রেষ্ঠ সিংহাসন।

বিচার পর্ব ৬

চিত্রগুপ্ত- কবির এত যন্ত্রণা কিসের? একটু খোলসা করে বলবেন?

কবি- এটা বোঝানো খুব মুশকিল স্যার।

চিত্রগুপ্ত- না যন্ত্রণা যখন হয় তার তো একটা কারণ থাকবে। আচ্ছা ঠিক কী রকম যন্ত্রণা হয়?

মানে ধরুন

পেটে ব্যথা/ মাথা ব্যথা / গা বমি

কোনও রক্তপাত

পুরানো অপারেশন টাইপ

গুপ্ত রোগ

মানসিক যন্ত্রণা

ক্রনিক রোগ

এমন ধরনের কিছু কী?

কবি- কবিতা আসলে প্রসবের যন্ত্রণার মত।

চিত্রগুপ্ত- তাই নাকি? আচ্ছা আপনি তাহলে মাতৃসমা যন্ত্রণা অনুভব করেন বলেছেন?

কবি- ঠিক তাই।

চিত্রগুপ্ত- তাহলে সেই যন্ত্রণা দেবার পিতা কে?

কবি- মানে স্যার?

চিত্রগুপ্ত- মাই লড ভাবুন। খুব কষ্ট হচ্ছে, বিষণ্ণ লাগছে, অজস্র যন্ত্রণা হচ্ছে। টুপ করে একটি কবিতা লিখে ফেললেন কবি আর সমস্ত যন্ত্রণার ইতিকথা।

অর্থাৎ রুগীর অসুবিধে হচ্ছে ওষুধ দেওয়া হল রুগীর উপশম হল। এখানে কবিতা হল ওষুধ আর রুগী হল কবি নিজে। তাহলে ডাক্তার কে?

আমি মনে করি কবি কে হতে হবে ডাক্তার আর তার লেখা ওষুধে সুস্থ হয়ে উঠবে অসুস্থ রুগী। তার দেওয়া এন্টিবায়োটিকে বেড়ে উঠতে পারবে না সমাজের কীট। তার আবিষ্কৃত টীকায় সমূলে মারা পড়বে অন্ধকারের বীজ।

কিন্তু ভাবুন সেই ডাক্তারই যদি নিজে রুগী হয়ে যায়, নিজের যন্ত্রণা উপশমের জন্য দরকার হয় ওষুধ তাহলে এ সমাজের অজস্র রুগীর চিকিৎসা করবে কে! টীকা দেবে কে!

বরং কবিকে যন্ত্রণা মুক্ত হতে হবে। অজস্র মানুষ যারা যন্ত্রণায় ভুগছে তাদের সেবায় নিজেকে ব্রতী করতে হবে। কলমে ভরে নিতে হবে পাঁচ লাইন এন্টিবায়োটিক....

যম- কথা ঠিক। আচ্ছা মৃত্যু যন্ত্রণা অনুভব করেছেন কখনও?

কবি- মৃত্যুসম যন্ত্রণা অনুভব করতে চাওয়া তো কবি সর্বত লিখে এসেছেন, আমিও।

যম চিত্রগুপ্তের দিকে তাকালেন।

চিত্রগুপ্ত- আপনি কি জানেন মর্তে ও এখানে তা আইনত দণ্ডনীয়?

কবি- হ্যাঁ হুজুর তা তো জানি। কিন্তু অনুভব করতে চাওয়া আর সত্যি কারের চাওয়া এক জিনিস?

চিত্রগুপ্ত- তার মানে কবিতার যে ভাব অর্থাৎ কবির মৃত্যু যন্ত্রণার সুখ, পাঠককে সবথেকে বেশি আন্দোলিত করে সেটিই বানানো , ফলস!

মাই লড নোট করবেন আইনত দণ্ডনীয় এক চাওয়া কে মন থেকে না চেয়েও তার ভাব বিস্তার করে শুধুমাত্র একটা অনুভূতি চেয়েছেন এই কবি।

মৃত্যু যন্ত্রণা যা আপনি দিয়ে থাকেন তা একটি সুখকর অনুভূতি এই কথা লিখে জনমানবে ভ্রম ও আপনাকে পরোক্ষে হেয় করেছেন। এটা একটা মস্ত বড় অপরাধ।

মর্তলোক পর্ব ৩

অনুরাগ জ্ঞান ফিরতেই চোখ মেলে তাকাল।

- কী হয়েছিল আমার?

- আরে না না কিছু হয়নি উত্তেজিত হয়ে একটু মাথা ঘুরে গিয়েছিল তোমার।

-ওহ।

- বলতে তো আমাকে হবেই আপনাকে আজ পেয়েছি যখন। জানেন তো ভাবতে অবাক লাগে এখনো কিছু কবি আকাশবাণীতে কবিতা পাঠ করতে যায়। যে রেডিওটার মহালয়া ছাড়া কোনও অস্তিত্ব নেই আমাদের জীবনে সেও কবিতা বাজায়। বস্তুত ওরা খুঁজেও দেখে না কে কী লিখছে। রেকমেন্ড করা চেলা ঝোলা ব্যাগে উপস্থিত হয় ঝাঁ চকচকে রুমে আর কবিতায় ঢুকে যায় আকাশ । সম্মাননা পাবার জন্য এই সব নম্বর জোগাড় করে রাখেন কবিরা।

অবাক লাগে উচ্চ চাহিদা সম্পন্ন কিছু মানুষ শুধু মাত্র জনপ্রিয় হবার জন্যই বর্তমানে কবিতা লিখছে। একটু মজা হৈ হুল্লোড় ইত্যাদি। আবার কিছু মানুষ শুধু আনন্দেই লিখে চলেছেন। আনন্দ আর মজা কি এক জিনিস?

কবিতা লিখিয়ে এখন যেন সেই অতিপরিচিত বিহারের পরীক্ষার্থীর মত যাকে পরীক্ষা হলের পিছন দিয়ে নোট সাপ্লাই করছে রেকমেন্ডকারী যে নিজেও একসময় রেকমেন্ডেড ছিল। আসলে গোটা সিস্টেম টাই ভেঙে পড়েছে। চাহিদা শেষ হওয়া কবিটিরও দেখা নেই। আর দেখুন তো এই ঘোর কলিতে আমি কালিদাস খুঁজছি। শিক্ষার হার বাড়ছে। মানুষ কবিতা লিখতে পারছে। কবিতা এখন তো নির্মাণ। আজ যার ভাষাজ্ঞান অক্ষরপরিচয় হয়েছে সেও আমার কাছে একজন প্রাথমিক কবিই আর তার কোনও রেকমেন্ডেশন দরকার আছে কি?

- আর কবিতার বৃহৎ উদ্দেশ্য ?

-সমস্ত প্রফেশন বা কাজে প্রথম দিকে একটা জৌলুস থাকে,কবিতাও তাই। যত দিন যায় অন্যরা আগ্রহী হয় সেই কাজ দেখে, তারাও এগিয়ে যায়, যদিও ততক্ষণে অনেকটা কাজ এগিয়ে গেছে। ভিড় যত বাড়তে থাকে তত শুরু হয় ছোট ছোট জোট বাঁধা, সবাই কাজ করতে চায়। এইসব দেখে এখানে কিছু প্রাপ্তি হতে পারে এই ভেবেও কিছু লোক যারা কাজটা জানেই না বা করে না তারাও ঢুকে পড়তে শুরু করে।

যেহেতু বিষয়বস্তু বেশিরভাগই পূর্বজরা লিখে ফেলেছেন তাই অন্য কিছু করতে শুরু হয় ফর্ম বদলানো বা অ-বিষয়বস্তু ঢোকানো। ফলে পাঠক বিমুখ ও একটা হাস্যকর জায়গায় পৌঁছানো। এই ভাবে হ য ব র ল হতে হতে এখন লেখালেখি সকলে কাজ না থাকলে টুকটাক করে। এবার কেউ সেটা নিয়েই ফাটায় আর কেউ সেটা নিয়ে শান্তি পায় কেউ মজা পায়। কবিভাব ব্যাপার টা একেবারে চুনো ও ধাপ্পাবাজির জায়গায় গিয়ে পৌঁছেছে।

একটু সমাজের ভিতরে যেতে হবে। শুধু মাত্র কিছু পাবার আশায় যারা পিছন কামড়ে পড়ে আছে তারা কী ভাবছে ধীরে ধীরে সেটা নগণ্য হয়ে যাচ্ছে। গোটা পরিসরটা হয় কবি হয়ে যাচ্ছে অথবা একটা ক্ষুদ্র পরিসরে কবি ও কবিতা চলে যাচ্ছে। সেই সামান্য পরিসরেই লেহন তোষণ মর্দন। অথবা গোটা পরিসরে শুধু মজা মাত্র এবং অদ্ভুত ভাবে ভাবতে হচ্ছে কবিতা কী জন্য ও কেন। আমার তোমার তোমার আমার জন্য নিশ্চয় নয়। কবিতার বৃহৎ উদ্দেশ্য আর কোথায় থাকল বলুন।

শুনলে হয়ত আপনি হাসবেন এখনো অনেক কবি ভাবেন বাংলাদেশ মাঝে মাঝে গেলে, সভা পাঠ আর সেখানের দু চার কবি নিয়ে আলোচনা বক্তব্য রাখলে বোধহয় ইন্টারন্যাশনাল কবি হওয়া সম্ভব।

আবার অবাক লাগে যখন দেখি দুর্বল লেখা নিয়ে কারো নামী প্রতিষ্ঠান থেকে বই ছাপছে আবার বিশিষ্ট কবিগণ সেই বই হাতে নিয়ে দু কথা বলছে। কয়েকটা সাহিত্যসেবা বই বেরোনো মাত্রই সম্মাননা দেবার জন্য রেডি হয়ে যাচ্ছে। উচ্চ ডিগ্রী আর হাই প্রফেশন অথবা অন্য রাজ্য নিবাসী, বা মাঝে মাঝে হিল্লি দিল্লি লোকজন দেখলেই বই পড়ার আগেই তার কবি লেখক কুষ্ঠি বানিয়ে ফেলে কিছু অর্ধ উৎফুল্ল পাবলিক। বিদেশের চার লাইন ইংরেজি কবিতা লেখা কাউকে দেখলেও তাদের সেই একই অবস্থা হয়ে যায়। আমি জানি না কেন।

বিশ্বাস করুন একজন কবি দু চার লাইন যা লিখছেন তেমন বহু লোক শুধু টাইম পাশ

করার জন্য ফেসবুকেই লিখছে। খালি তারা কবি হবে বলে লিখছে না। চাইলেই তারা পত্রিকা ইত্যাদিতে লিখে কবি তকমা নিতে পারে এমনকি দু এক কবি ধরলে জুটতে পারে পুরস্কারও।

এইগুলি এই দুই পাঁচ জন দলকবি যারা নিজেদেরই কেবল কবি ভাবে তারাই ছড়াচ্ছে যে আমরাই লিখি, পড়াশুনা করি, সাহিত্যের ধারা বদলাচ্ছি, ধারক বাহক ইত্যাদি ইত্যাদি। ব্যাপারটা আর তেমন নেই।

আচ্ছা ভাবুন কোন কবি নিজে উঠে এসেছেন? খুব কম। কবি দ্বারা উঠিয়ে আনা হয়েছে। এই উঠে আসার ব্যাপারটাও এখন গড়বড়ে। পিউর পাঠক সাধারণ মানুষ অনেকে তাদের নামই জানে না। তবে কি তারা কবিদের মধ্যে কবি হয়ে উঠে এলেন?

আসলে এখনের কবিরা গবাদি পালের মত। একখানে সকলে জমা হবার পর দুই এক করে বিক্ষিপ্তভাবে ছড়িয়ে পড়তে থাকে। তারপর কোন স্থানে বেশি ভিড় জমলে ধীরে ধীরে সব সেইখানে জড়ো হয়। আবার সেখান থেকে বিক্ষিপ্ত আবার অন্য কোথাও জড়ো হবার প্রক্রিয়াটি চলতে থাকে। পাঠক রাখালের ন্যায় বাঁশি বাজায় মাদাল গাছের তলায়। জানে ঘর পোড়া গরুগুলি মেঘ দেখলে এদিক ওদিক ছুটে যায় বটে তবে সন্ধে হলে ঠিক ফিরে আসে কারণ গোয়াল তো সে'ই দেবে।

- আচ্ছা এই যে তুমি বললে ফেসবুক বা অন্যান্য জায়গায় অনেকেই ভাল লিখছে কিন্তু বই কেনার ব্যাপারে পাঠকরা এখনো কেন পরিচিত বা ওই বিশেষ কিছু পত্রিকায় লিখিয়েদেরই বই কিনতে পছন্দ করে?

- দেখুন এটা একটা ফ্যান্টাসি বা প্যাশন বলতে পারেন। রাস্তায় বা বাড়িতে কেউ জিজ্ঞেস করলে বলা তো যাবে এটা অমুক এর বই আরে নাম শুনিস নি? ওই যে অমুক পত্রিকায় লেখে। বিজ্ঞাপন এসেছিল তো পুজোতে। এখানে কতকগুলো ব্যাপার কাজ করে যেমন আমি পেপার পড়ি বিজ্ঞাপন দেখি আপডেট আছি আমার একটা choice of status আছে। আর এক অচেনা লেখক কবির নাম নিলে তো মুশকিল হয়ে যায়। After all সমাজে প্রাজ্ঞতাই এখন প্যাশন। সেটা বুঝে, অবুঝে, পড়ে, না পড়ে আলমারি সাজিয়ে রেখে যেকোনো ভাবেই হতে পারে।

-তাহলে তুমি কি বলবে পাঠকদের মান পড়ছে?

- একথা বলতে পারি না, পাঠকরা এখন লেখকদের সমতুল্য জনপ্রিয়তা চায় এইটুকু বলা যায়। সেটা তার বই সই সহ ফেসবুকে পোস্ট করে হোক অথবা তার সাথে সেলফি তুলে হোক।

আর কেনই বা চাইবে না পাঠকই লেখককে বাঁচিয়ে রাখে। সময়ে ও সময়ের পরে।

- তোমার কথা অনুযায়ী সময়ের পাঠকদের থেকে সময়ের পরের পাঠকদের গুরুত্ব বেশি?

- অবশ্যই। কিন্তু সময়ের পাঠকদের মূল্যায়ন কিছুটা হলেও প্রভাবিত করে বইকি সময়ের পরের পাঠকদের।

-তাহলে?

-তাই তো সময়ের পাঠককে বেঁধে রাখতে চায় কবি সেটা যেভাবেই হোক। কারণ সময়ের পরের পাঠক কবির হাতে থাকে না।

 

বিচার পর্ব ৭

যম- আচ্ছা চিত্রগুপ্ত বর্তমানে কবিতা দিয়ে কোনও রিভোলিউশন করা সম্ভব?

চিত্রগুপ্ত- মাই লড যা নথি দেখছি তাতে মনে হয় না আর কোনও রিভলিউশন করা সম্ভব।

কবিতা মুখ দিয়ে পাঠ হচ্ছে কান দিয়ে শোনা হচ্ছে মগজ দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে। বেশিরভাগই নতুন বোতলে পুরাতন মদ। শব্দকে এত কচুকাটা করা হয়েছে যে শব্দও আর কবিতায় ঢুকতে না পারলে বাঁচে। এত বই বের হচ্ছে যে পাঠক কিনতে গিয়েও রান্নাঘরের বই কিনে আনছেন। কবিরা নিজেদের মধ্যে ঝগড়া ঝাটি করে বাজার নোংরা করছেন। কবিরাই কবিতা লিখছেন, পড়ছেন। সাধারণ মানুষের অত সময় কই?

আর তাছাড়া অনেক কবি হয়ে যাওয়ায় কবিরা যখন নিজেদেরই অস্তিত্বহীনতায় ভুগছেন সেখানে অস্থি খাড়া করবে কার!

- রায়দানের পূর্বে চিত্রগুপ্ত আমি জানতে চাই পত্র পত্রিকা, কবিতা পাঠ, মিডিয়া, মাথায় হাত ইত্যাদির মাধ্যমে আর কি কোনও কবি উঠে আসা সম্ভব?

- নেই বললেই চলে। ব্যাপারটা আগে ছিল। বিশেষ কোনও পত্র পত্রিকায় প্রকাশ মানেই সে কবি হয়ে উঠে এলো। বিশেষ কেউ মাথায় হাত দিল মানেই সে সর্বজনবিদিত হয়ে গেল। এখন আর তা সম্ভব নয়। কোনও একক পত্র পত্রিকা সেই কাজ আর করতে পারবে না। কোনও একক কবির ছত্রছায়ায় থাকলেই সে কবি হয়ে উঠবে তাও সম্ভব নয়। এখন কবির সংখ্যা বেড়েছে, শিক্ষার হার বেড়েছে, এত সহজে আর কবি হিসাবে কাউকে চাপিয়ে দেওয়া যাবে না। পাঠকও লিখতে শুরু করেছে। তাই কবি হিসাবে সহজে মান্যতা কেউ কাউকে দেবে না। পাঠক আজ নিজেই কবি হতে চায়।

 

রায়দান পর্ব

হে কবি! তোমার অপরাধগুলি আমি পড়ে শোনাচ্ছি তুমি শ্রবণ করো।

১। জীবিত দশায় কবি হিসাবে অনেক কবিতা লিখে থাকলেও তার প্রচারে তুমি অসৎ পথ অবলম্বন করেছিলে।

২। নিজ কবিত্ব প্রচারে দল গঠন করেছিলে।

৩। অনুজ কবিদের সাথে বসে অন্য কবিকে কিভাবে কাঠি করা যায় তার পরিকল্পনা করেছিলে।

৪। তোমার সম্পাদনার পত্রিকায় যোগ্যদের সুযোগ থেকে বঞ্চিত করেছিলে।

৫। মহান কাব্য ও অন্যান্য ভাল বই, তরুণ কবিদের ভাল কবিতার সার নিজের কবিতায় টুকেছিলে।

৬। ফেসবুকে কেবলমাত্র নিজের প্রচারই করেছিলে।

৭। কবিতা লেখার জন্য বাস্তবে অবাস্তবে বহু প্রেম করেছিলে এমনকি নারী শরীরও নিজের কাব্যে ব্যবহার করেছিলে।

৮। নিয়তি ও কর্মফলে প্রাপ্ত যন্ত্রণা বা আনন্দে থাকা জীব কে শুধুমাত্র কয়েক পাতা পড়িয়ে যন্ত্রণা প্রাপ্ত জীবকে আনন্দ, আর আনন্দে থাকা জীবকে যন্ত্রণা দিয়ে সুখ দুঃখের ভারসাম্য নষ্ট করেছিলে।

৯। কবিতাপাঠ নামক ভাঁওতায় নিজের নাম ও নিজের ছত্রছায়ার কবিদের নাম পরিকলিপ্ত ভাবে ঢুকিয়েছিলে।

১০। নিজের পুরস্কার প্রাপ্তির জন্য নিজের মূল্যবোধ শিকেয় তুলেছিলে।

১১। প্রতিবাদের সমস্ত লেখাই ছিল পূর্বপরিকল্পিত।

১২। সততা ও বিবেকের কাছে আত্মবিসর্জন দিয়ে উৎসবের আবহে বছরের পর বছর পাঠক ঠকিয়েছ।

১৩।অন্যকে মৌনতার পরামর্শ দিয়ে নিজেই নিজের কথা বলেছ।

১৪। কবিতা লেখা খুবই কঠিন কাজ, সকলের কম্ম নয় বার বার বলে অনেক তরুণ কবিদের থামিয়ে দিয়েছ।

১৫। অর্ধ সময়ে তুমি কেরানী বাকী অর্ধ সময়ে লেখালেখির কাজ করে সাহিত্যকে ঠকিয়েছ।

১৬। রচনার থেকে পুরস্কার প্রাপ্তিতেই অধিক সময় ব্যয় করেছো।

১৭। নিজের স্ত্রী পুত্র কন্যা কে সময় দাও নি, সংসার ধর্ম পালন করো নি।

১৮। কবিতা জগতের অন্যায় সায় দিয়ে গেছো, তাকে দূর করার প্রয়াস করো নি।

১৯। কবিতা লিখে সমাজের একটি উপকারও করতে পারো নি।

২০। মৃত্যু যন্ত্রণা সুখকর অনুভূতি এই কথা লিখে জনমানবে ভ্রম তৈরি করেছো।

২১। কয়েকজন কবির মধ্যেই ঘোরাফেরা করেছ। কবিতাকে সীমিত ও ক্ষুদ্র পরিসরে নিয়ে গেছো, যেখানে ছড়িয়ে দেওয়া উচিত ছিল।

২২। বারবার সুযোগের জন্য কবিতার বিভিন্ন গোষ্ঠী, দল বদলেছ।

২৩। গ্রাম জেলা থেকে কবিদের বঞ্চিত করেছ।

২৪। বিদেশি বই থেকে নির্যাস টুকেছ।

২৫। অন্যদের থেকে আলাদা লিখতে গিয়ে কবিতার প্রাণঘাত করেছো।

২৬। নিজেদের মধ্যে তরুণ কবিদের সামনেই ঝগড়াঝাঁটি করেছো।

২৭। সুরা, গাঁজা থেকে আরম্ভ করে নারী কোনও নেশাই বাদ দাও নি।

২৮। নিজের থেকে শক্তিশালী কবিকে যেন তেন প্রকারে উঠতে দাও নি।

২৯। কবি হিসাবে মানুষ যে বাহ্যিক ও অন্তর রূপ মনে ধারণ করে রেখেছিল তা বিনষ্ট করেছো।

৩০। সমাজে কবি ও কবিতা প্রায় অবলুপ্ত হবার পথে, এর জন্যও প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভাবে তুমিও যুক্ত।

শব্দ হল পরম ব্রহ্ম। আর কবি হলেন অগ্নির স্বরূপ। তাই আমি ঋগ্বেদ থেকে কবির আবাহন করছি।

হে কবি ! তুমি দীপ্তিমান মর্তগণ পাঠ নিয়ে তোমার স্তব করে। তুমি সর্বযোগী, আমিও তোমার স্তব করছি। তুমি রায় গ্রহণ করো।

যে সকল অতৃপ্ত অগ্নির প্রজ্বলন হতে থাকে পঞ্চভূতে সেই অগ্নি তৃপ্তির উদ্দেশ্যে কবিকে আহ্বান করেন।

মনুষ্যলোক প্রতিটা নবশিশুর মুখে সেই ওম স্থাপন করেছে শব্দের আকারে।

হে কবি! দাবাদহে দাবানল যেমন বনকে দগ্ধ করে তেমনি তোমার মুখ থেকে নির্গত প্রতিটা ওম সকল শরীর ও মনকে দগ্ধ করতে পারে।

তোমার শব্দের চয়ন সর্বত্রসুন্দরে ব্যাপ্ত হয়।

হে কবি! তোমার প্রতিটা ছত্র মিত্র স্বরূপ যা পড়ে মর্তলোকের সব পাপ সব গ্লানি সব ব্যথা মুছে যায়।

তুমি শব্দবলিয়ান। তোমার কলম অস্ত্র ন্যায় , সমাজশত্রুকে পরাভূত করে তুমি সুখ সমৃদ্ধি বজায় রাখো।

হে কবি! তোমার ব্যাপ্তি জলে স্থলে আকাশে । তোমার বিচরণ ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্রে , বৃহদে মহাবিশ্বে । তুমি প্রতিটা প্রাণে অনন্তের পথ দেখাও।

হে আনন্দদায়ক কবি, হে চেতনার কবি, হে বোধের কবি স্বয়ং ব্রহ্মার নাভি ও সরস্বতীর পাদপদ্মে তোমার স্থান, তুমি লোকহিতে পূজ্য।

হে কবি! তোমার সকল শব্দের শিখা চতুর্দিক প্রদীপ্ত করে রেখেছে , সেই আলোই তোমার প্রকাশ তোমার প্রতিষ্ঠা তোমার রহস্য তোমার স্বরূপ।

কবিতা পারে নতুন সমাজের জন্ম দিতে, নবজাগরণে সামিল হয়ে পুরাতন ভেঙে এগিয়ে যাবার স্রোত তৈরি করতে। শব্দই ব্রহ্ম। শব্দের উচ্চারণ হল শক্তি। কবিতার ছত্রে ছত্রে সেই শক্তি সঞ্চিত থাকে। পাঠক তাকে নিজ শরীরে বয়। জন্ম থেকে জন্মান্তরে ছড়িয়ে পড়ে সেই শক্তি। তাই তো শব্দ অমর।

এমন শব্দের সৃষ্টিকর্তাকে কেবল মাত্র একটাই শাস্তি দেওয়া যেতে পারে। মুক্তিহীন জন্মের। হে কবি তুমি পৃথিবীতে বার বার জন্ম নেবে। তুমি হবে অপূর্ণ। পূর্ণতা পেতে তুমি লিখে যাবে জন্মের পর জন্ম। তোমার মুক্তি নেই। তোমার শান্তি নেই, তুমি লোকারণ্যে বার বার হারিয়ে যাবে। তোমার সংসার হবে অপূর্ণ, আজন্ম তুমি হবে আসক্ত, শরীর থেকে সুন্দরে ব্যাপ্ত হবে তোমার বিন্যাস, তোমার মিত্র নেই, শোক নেই, সুখ নেই, তুমি হবে এক কল্পতরু। কল্পনার মরীচিকায় তোমার তৃষ্ণা মিটবে না কখনো। তোমার যাপন হবে অসামাজিক। অজানা যন্ত্রণায় তোমার মৃত্যু ঘটবে বারবার, অথচ তোমার কায়া জীবিত থাকবে। তোমার সমস্ত সৃষ্টি একদিন আর তোমার থাকবে না। সারা বিশ্বের পাতায় অক্ষরে অক্ষরে তুমি মিশে যাবে। এর থেকে বড় শাস্তি, যন্ত্রণা পৃথিবীতে আর কারো নেই। তুমি অগ্নির মতো পৃথিবীতে জ্বলতে থাকো আদি অনন্তকাল।

কবিকে পৃথিবীতে আরও এক কবিজন্মের শাস্তি প্রদান করা হল।

ওম শান্তি।

 (সমাপ্ত)


কোন মন্তব্য নেই

Blogger দ্বারা পরিচালিত.